গুপ্তধন
অনুবাদ: রেখা চট্টোপাধ্যায়
ওকার উত্তরে সমস্ত অরণ্যময় জায়গাটাকে বরাবরই ‘দ্রেমুচি’[১]বলে উল্লেখ করা হয়।
এই অরণ্যের মধ্যে অনেক মাইল ধরে আর্কাদি গাইদার[২]এবং আমি ঘুরে বেড়িয়েছি। সেটা কিন্তু অনেক দিন আগেকার কথা—চতুর্থ দশকের গোড়ার দিকে।
ঘুরে বেড়াবার সময় একাধিকবার এই প্রাচীন কথা ‘দ্রেমুচি’ অরণ্য সম্বন্ধে আলোচনা করেছিলাম। রুশ ভাষার প্রয়োগনৈপুণ্য আমাদের অতিশয় আনন্দ দিয়েছিলো, কারণ বাস্তবিকই এই ঘন অরণ্যকে মনে হয়েছিল বুঝি গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এক ধ্যানমগ্ন স্তব্ধতা শুধু যে অরণ্যের উপরই নেমে এসেছে তাই নয়, হ্রদ এবং গেরুয়া রঙের জলে ভরা মন্থর নদীগুলির উপরেও। তাদের তীরগুলোয় সারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে লিনিস গাছ, যেগুলোর অন্য আর এক নাম হলো ‘ঝিমন্ত-মাথা’। অরণ্যের ঝোপঝাড়ে এই গাছগুলোকে ভারি মানায়, কারণ তাদের ডগাগুলো অলসভাবে দুলতে দুলতে একেবারে মাটি পর্যন্ত নেমে আসে।
সেখানে ছিল বড় অনাবাদী জমি, দাবানলে জায়গাগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে, আর ছিল ঝড়ে-ভাঙা জট পাকানো ডালপালা। জলা জায়গাগুলোর উপর দিয়ে ঠাণ্ডা বাষ্প পাকিয়ে-পাকিয়ে উঠছে। মেঘের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে মশা গুঞ্জন করছে আকাশে। অরণ্যের নানা অংশ একেবারে পতিত জমিতে পরিণত করেছে শুঁয়োপোকারা, অন্যান্য জায়গায় ঘন জাল বুনেছে মাকড়সা।
প্রায়ই আমরা এই আশার কথাটা বলাবলি করতাম যে শীঘ্রই সোভিয়েত সরকার এই উপেক্ষিত অঞ্চলকে যন্ত্রপাতির সাহায্যে কাজে লাগাবার সময় পাবেন এবং শেষ পর্যন্ত এখানকার যে প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তা মানুষের কাজে লাগবে।
অরণ্যের একটা ফাঁকা জায়গায়, যেটার নাম ‘সরকারী খাত’, একটি ঘরওলা এক কুটীর দাঁড়িয়ে ছিল অগভীর এক খালের পাশে। তার দুপাশে স্পীয়ার ঘাসের ঘন জঙ্গল। এই খালটার নামই ‘সরকারী খাত’। সে নাম থেকেই ফাঁকা জায়গাটারও নামকরণ হয়েছে।
গত শতাব্দীর ষষ্ঠ দশকে খালটা কাটা হয়েছিল ‘বিরাট জলা’টার জল নিষ্কাশনের জন্যে, কিন্তু ইঞ্জিনিয়াররা নিশ্চয়ই ভালো কাজ করেনি, কারণ জলাটা শুকোয়নি। স্থানীয় জমি উন্নয়নকারীদের ব্যর্থতার কথা খালটা মনে পড়িয়ে দেয়।
গ্রীষ্মকালে ঐ কুটীর অধিকার করে আলকাৎরা চোলাইকারী লোকরা—বৃদ্ধ ভাসিলি এবং তার প্রায় ন’বছর বয়সের পৌত্র তিশা।
একবার আমরা ভাসিলির সঙ্গে এক রাত ছিলাম।
সন্ধে হয়ে আসছিল আর শুকনো হলদেটে কুয়াশা জড়িয়ে ছিল ফাঁকা জায়গাটায়। রজনমাখা গাছের গুঁড়িগুলোর মধ্যে গঙ্গাফড়িংগুলো ডাকছে আর চঞ্চল পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। ঘোলাটে সূর্য ছোট ছোট গাছগুলোর ওপাশে ডুবতে চলেছে। খালের মধ্যে মাছের পোনা এখানে ওখানে লাফাচ্ছে আর জল ইঁদুরগুলো করছে কিচ কিচ।
ছোট্ট কুটীরের দেওয়ালে ঝুলছে একটা অস্পষ্ট-হয়ে-আসা লিথো করা ছবি: ‘শীত প্রাসাদের দখল’।
আমরা কিছু রাস্ক-বিস্কুট এবং চিনি এনেছিলাম। তিশাকে ভাসিলি বললো সামোভারটা চড়াতে।
চা পানের সময় জামার আস্তিন দিয়ে কপালের ঘাম মুছে ভাসিলি বললো:
‘আমাদের কাজটার একটা ভালো দিক আছে—অনেককাল বাঁচা যায়। আমরা, আলকাৎরা চোলাইকারীরা, সুস্থ সবল লোক, কারণ আলকাৎরায় আমরা ডুবে থাকি। কোনো অসুখ-বিসুখ আমাদের কাছে আসতে পারে না—এমন কি মশাগুলোও দূরে থাকে। অবশ্য দূর দৃষ্টি নিয়ে দেখতে গেলে দেখা যাবে যে এ ধরনের জীবনে বিশেষ কিছুই নেই, আলকাৎরা আর কয়লা, পতিত জমি আর ধোঁয়া ছাড়া কিছুই আর নেই। ঠিক কথা—পতিত জমি!’ কথাটার পুনরুক্তি করে আলকাৎরায় কালো হয়ে যাওয়া আঙুলগুলো দিয়ে তুষার ধবল চিনির একটা টুকরো আলগোছে সে তুলে নিলো। ‘এটা সব সময়েই নির্বান্ধব-পুরী। মনে হয় সরকার যেন আমাদের ভুলে গেছে।’
তিশা বললো, ‘সম্ভবত আমাদের পালা এখনো আসেনি।’
‘শোনো, মস্কো থেকে যদি আমার ডাক আসে আর তারা যদি আমার মতামত চায় তাহলে অনেক কথাই বলবো! আর্কাদি পেত্রোভিচ, এর ব্যবস্থা কি করতে পারেন না? অল্প দিনের জন্যে মস্কো যাওয়া?’
গাইদার বললেন, ‘এটা অতো সহজ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments